← Literary Works

1911

By Dr. Bishwajit Chakraborty · 13 October 2023

ভারতীয়  ফুটবলের জনক

১৮৭৭ সাল, যখন কলকাতাকে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী হিসাবে বিবেচনা করা হত। সেই সময়, নগেন্দ্র প্রসাদ সর্বাধিকারী নামে একটি কিশোর ছেলে Calcutta এফসি গ্রাউন্ডের কাছে খেলা দেখছিলেন। ইউরোপীয়রা সেখানে একটি বল তাড়া করছিল, তখন একটি বল তাঁর কাছে এসে পরে। তখন তিনি আনন্দের সাথে বলটিকে মাঠে ফিরিয়ে দেন এবং এই প্রক্রিয়ায় তিনি ফুটবলে কিক করা প্রথম ভারতীয় হয়ে ওঠেন। পরবর্তীকালে তিনি খেলাটির প্রতি এতোটাই আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলেন যে হেয়ার স্কুলের সহপাঠীর কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে কলকাতার স্পোর্টস স্টোর "ম্যান্টন  অ্যান্ড কোম্পানি" থেকে একটি ফুটবল কিনেছিলেন। সর্বাধিকারী ছিলেন সেই অগ্রগামীদের মধ্যে একজন যিনি বাংলার ভারতীয় জনগণের মধ্যে ফুটবল ক্লাবগুলিকে জনপ্রিয় করার জন্য ব্যাপক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। সীমিত সময়ের মধ্যে, তিনি ১৮৮৭ সালে ওয়েলিংটন এবং শোভাবাজার এর মতো বিভিন্ন ফুটবল ক্লাব সংগঠিত করার সাথে জড়িত ছিলেন। নগেন্দ্রপ্রসাদ,  ওয়েলিংটন ক্লাবের একজন খেলোয়াড় মনিদাস কে ক্লাবের হয়ে খেলতে না দেওয়ার জন্য ক্লাব পরিচালক এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন এবং ক্লাব ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে শোভাবাজার রাজ পরিবারের সহায়তায় শোভাবাজার ক্লাব গঠন করেন। শোভাবাজার ক্লাব ১৮৯২ সালে একটি ফুটবল খেলায় ব্রিটিশদের পরাজিত করে প্রথম ভারতীয় ক্লাব হিসেবে। সে বছর শোভাবাজার ক্লাব সারে রেজিমেন্টকে 2-1 ব্যবধানে পরাজিত করেছিল। প্রসাদের নেতৃত্বে ১৮৯২ সালে ভারতীয় ফুটবলঅ্যাসোসিয়েশন (আইএফএ) গঠন হয় এবং ১৮৯৩ সালে "আইএফএ  শিল্ড"  নামে প্রথম মার্কি ইভেন্টটি শুরু হয়েছিল। ভারতের সমস্ত অঞ্চলে ফুটবলকে অ্যাক্সেসযোগ্য করে তোলা এবং তরুণ খেলোয়াড়দের মধ্যে ফুটবলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করার সমস্ত অবদানের জন্য তাকে "ভারতীয় ফুটবলের জনক" উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল।

১৯১১ সাল

১৯১১ সালে একটি স্বদেশী দল হিসেবে মোহনবাগান  ভারতীয় ফুটবলের জন্য একটি বড় নজির স্থাপন করে। স্বাধীনতা পূর্বে ব্রিটিশ দল ইস্ট ইয়র্ককে হারিয়ে মেরিনার্স – সমগ্র দেশের জনতার হৃদয়ে প্রভূত ফুটবল উদ্দীপনা সৃষ্টি এবং পরাধীন জাতির মনে প্রাণসঞ্চার করেছিল। সেই সময়ে ক্লাবটির বয়স ছিল প্রায় 22 বছর। ঐতিহাসিক ১৯১১ সালের আগে, 20 শতকের শুরু থেকে মেরিনররা বেশ কয়েকটি ট্রফি জিতেছিল। তারা ১৯০৬-১৯০৯ সাল পর্যন্ত টানা চার বার ট্রেডস কাপ জিতেছিল, যা তখন ভারতের দ্বিতীয়-সবচেয়ে মর্যাদা পূর্ণ টুর্নামেন্ট ছিল। তারা ১৯১১ সালের আগে কয়েক বার কোচবিহার কাপ ও জিতেছিল। ১৯১১ সালের সম্মান অর্জন, শুধুমাত্র ভারতীয় ফুটবলকে চিরতরে বদলেই দেয়নি বরং প্রতিটি ভারতীয়র মনে স্বাধীনতা প্রাপ্তির প্রতি বিশ্বাসের সঞ্চার করেছিল। সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে, মোহনবাগান একটি বিস্ময়কর পারফরম্যান্স প্রদান করেছিল যা ভারতীয় ফুটবল ইতিহাস এ খোদাই হয়ে থাকবে। অভিলাষ ঘোষ এবং শিবদাস ভাদুড়ির গোলে মোহনবাগানের ঐতিহাসিক ২-১ গোলের ব্যবধানে জয়ের মাধ্যমে ম্যাচটি শেষহয়। মূলত ভারতীয় খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত ছিল মোহনবাগান দলটি, যেখানে ইস্টইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টেএ ব্রিটিশ সৈন্যরা খেলছিল। এই জয়টিকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতার জন্য, ভারতের সংগ্রামের একটি শক্তিশালী প্রতীক হিসাবে দেখা হয়েছিল। এই জয়টি ভারতীয় ফুটবল ভক্তদের মধ্যে গর্বের অনুভূতি জাগিয়ে ছিল। এই জয়টি অসংখ্য ভারতীয় ফুটবল প্রতিভার উত্থানকে অনুপ্রাণিত এবং সারাদেশে খেলাধুলার বিকাশ কে উৎসাহিত করেছিল।

এই ঐতিহাসিক বিজয়, স্বাধীনতা আন্দোলন কে প্রাণসঞ্চার করেছিল। ইংলিশম্যান (বর্তমানেস্টেটসম্যান) পত্রিকাটি জয়ের প্রভাবকে সংক্ষিপ্ত ভাবে তুলেধরে-- "মোহনবাগান সফল হয়েছে এই মিথ টিকে ভাঙতে যে, ব্রিটিশরা জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রে অপরাজেয়।" আরো একটি স্থানীয় সংবাদ পত্রে রিপোর্ট করেছিল যে ম্যাচের পরে শহরের ইউরোপীয় বসতগুলি অন্ধকার, নির্জন এবং শোকের চেহারা ধারণ করেছিল। ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বৃহত্তর ইতিহাস এ (এই কৃতিত্বর অবহেলাসত্ত্বেও), ১৯১১ সালে মোহনবাগান ক্লাবের অবদান সর্বদাভারতীয় ক্রীড়া- সামাজিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসাবে স্মরণ করা হবে।

ফুটবলে দেশভাগের জ্বালা

১৯০৫ সালে মুসলিম এবং হিন্দুলাইনে পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গকে ভাগ করা হয়েছিল। যদি ও ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন বলেছিলেন যে এটি করা হয়েছিল প্রশাসনকে দক্ষ ও সক্ষম করার জন্য। বঙ্গবাসী এই ভাগকে প্রচন্ড বিরোধিতা করেন। আন্দোলনকারীদের মধ্যে কবিগুরু, ঋষি অরবিন্দ এবং আরো অনেকে এতে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন। সেই সময়ে র্ভারতীয়রা নানান ব্যবসায়িক ও শিক্ষাগত সংস্থান গড়ে তোলেন। মূলত ব্রিটিশ অথরিটির রাজনীতি থেকে বাঁচবার জন্যে। ঋষি অরবিন্দ প্রিন্সিপাল হিসেবে যোগদান করেন ১৯১১ সালে (?), প্রথম ভারতীয় একাডেমিক ইনস্টিটিউশন – ন্যাশনাল কলেজ যা আজকে যাদবপুর ইউনিভার্সিটি নামে সর্বজনবিদিত। ১৯০৫ সাল থেকে বঙ্গভঙ্গর প্রতিবাদ স্বরূপ কবিগুরু ও প্রচুর দেশাত্মবোধক গান লেখেন, আপামর দেশবাসীকে ব্রিটিশদের কারসাজি থেকে সজাগ থাকার জন্য। পরবর্তীকালে এই দেশাত্মবোধক গানগুলির সংকলন "স্বদেশ" নামে প্রকাশিত হয়। আশ্চর্যজনক ভাবে বেশির ভাগ গানগুলি বাউলগানের সুরে সৃষ্টি। এছাড়া "জনগণমন" (আমাদের জাতীয় সংগীত) এবং "আমার সোনার বাংলা" গানগুলি স্বদেশ সংকলন এর অংশ। সবশেষে ব্রিটিশ চক্রান্তকে ব্যর্থ করে ১৯১১ সালে বাংলা পুনরায় একত্রিত হয়। যদি ও এইঘটনাটি তে যে সাম্প্রদায়িক ঘৃণার উদ্রেক করেছিল, তার ফলে ১৯৪৭ সালেস্থায়ী বিভাজন ঘটে এবং আজ ও জাতির মুখোমুখি এটি একটি গুরুত্ব পূর্ণ সমস্যা।

২৮শে জুলাই ১৯২০ সালে কোচবিহার কাপের একটি ম্যাচে মোহনবাগান ও জোড়াবাগান ক্লাব পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছিল। সেই ম্যাচে জোড়াবাগান দল এক অজানা কারণে তাদের ডিফেন্ডার শৈলেশ বসুকে না নিয়েই মাঠে টিম নামায়।দলের তৎকালীন সহ-সভাপতি সুরেশ চৌধুরী দলের কর্মকর্তাদের কাছে শৈলেশ বসুকে দলে না নেওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করেন এবং শৈলেশ বসুকে দলে নেওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু তারা সুরেশ চৌধুরীর কথা রাখেননি। তিনি ও শৈলেশ বসু বুঝতে পারেন, শৈলেশ বসু পূর্ববঙ্গীয় হওয়ার কারণেই বিদ্বেষবসতই তাকে দলে নেওয়া হয়নি। এরপরই সুরেশচৌধুরী, রাজা মন্মথনাথ চৌধুরী, রমেশ চন্দ্র সেন, অরবিন্দ ঘোষ কে নিয়ে ক্লাব ত্যাগ করেন এবংবাঙাল (পূর্ববঙ্গীয়) ভাবাবেগ কে প্রাধান্য দিয়ে তিন দিনের মধ্যে ১লা আগষ্ট ১৯২০সালে ক্রীড়া এবং সাংস্কৃতিক ক্লাব হিসাবে ইস্টবেঙ্গল ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন। ইস্টবেঙ্গল ফুটবল ক্লাব হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে ওই মাসেই হারকিউলাস কাপে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। ১১আগষ্ট ১৯২০ ইস্টবেঙ্গলের প্রথম ম্যাচে মেট্রোপলিটন কলেজের বিরুদ্ধে ৪-0 গোলের ব্যবধানে জয়লাভ করে যাত্রা শুরু করে এবং হারকিউলাস কাপ জয় করে। ১৯২১ সালে খগেন্দ্র শীল্ড প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়।

এরপরই ভারতীয় ফুটবল অ্যাসসিয়েশনের সদস্যতা পায় এবং আইএফএর দ্বিতীয় ডিভিশনে লীগ খেলার অধিকার অর্জন করে। তারা তাদের উদ্বোধনী লীগে তৃতীয় স্থান অধিকার করে। ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগানের মধ্যে ১৯২১ সালে ৮আগষ্ট কোচবিহার কাপের সেমিফাইনালে প্রথম অনুনমোদীত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গোলশূণ্য ভাবে ড্র হয়। ১৯২৪ সালে আইএফএ দ্বিতীয় ডিভিশনে দ্বিতীয় স্থানে শেষ করলে ও ইস্টবেঙ্গল আইএফএ প্রথম ডিভিশনে খেলার সুযোগ পেয়ে যায়। ''ক্যামেরুন এ '' আগে থেকেই প্রথম ডিভিশনে থাকায় ''ক্যামেরুন বি '' প্রথম হয়ে ও প্রথম ডিভিশনে খেলার সুযোগ ছিল না, তাই ইস্টবেঙ্গলের কাছে প্রথম ডিভিশনে খেলার দরজা খুলে যায়।

ইস্টবেঙ্গল এফ সি অন্যতম ঐতিহাসিক ফুটবল ক্লাব প্রাক-স্বাধীন ভারতে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং সংগ্রামের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান হিসাবে প্রতিষ্ঠিত। এটিই একমাত্র ভারতীয় ক্লাব যার নামে তিনটি আন্তর্জাতিক ট্রফি রয়েছে এবং এটি দেশের সবচেয়ে কিংবদন্তি ফুটবলারদের আবাসস্থল। এই ক্লাব এর সমর্থকবেস নিয়ে গর্ব করার মতো এবং এটি যেকোনো শীর্ষইউরোপীয় ক্লাবকে লজ্জায় ফেলে দেবে। ইস্টবেঙ্গল ২০১৯ সালে তাদের অস্তিত্বের শততম বছরে পদার্পণ করেছে এবং ভক্তদের মধ্যে উদযাপনটি সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিযেছে।

দেশ ভাগের সময় বহু মানুষ তাদের দেশ ছেড়ে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে বা ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ এ আশ্রয় নিয়েছিলেন। বাস্তুচ্যুত এই মানুষগুলো সবকিছু হারানোর বেদনা এবং শুন্য থেকে পুনঃ জীবন শুরু করার সংগ্রাম, ছেড়ে আসা পূর্ববাংলার প্রতি তাদের অনুভূতি কে তীব্র করে তোলে। সেই মানুষ গুলো ফুটবলের মাধ্যমে অনুভূতি প্রকাশ করার একটা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিলেন। দেশভাগের রাজনীতির কারণে তাহাদেরকে শতাব্দী ধরে তাদের ভালোবাসার ভূমিকে ছেড়ে এপার বাংলাতে চলে আসতে হয়েছিল। কিন্তু ফুটবল তাদের পরিবর্তন কে মেনে নিতে, এবং তাদের নতুন বাসস্থানে যে বৈষম্যের বা বিভাজনের মুখোমুখি হয়েছিলেন তার বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস জুগিয়েছিল।